বাংলাদেশ

Souhardo Desk,

5:13 PM, 25 March, 2022 LAST MODIFIED: 5:13 PM, 25 March, 2022

আজ মহান স্বাধীনতা দিবস

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ-পরিক্রমণ সমাপ্ত করে বাংলাদেশ পা রাখছে ৫১তম বছরে। পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ নবীন রাষ্ট্র বটে, তবে এর ইতিহাস ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে মানুষের আদি বসতি স্থাপনের পর সভ্যতার নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে নির্মিত ও বিকশিত হয়েছে বাঙালির সত্তা ও সংস্কৃতি। বিশ শতকের সূচনাকালে ঔপনিবেশিক পীড়নে জর্জরিত বাংলার দুর্গতি আরও জটিল হয়েছিল শাসকদের ‘ভেদ করো ও শাসন করো’ নীতির প্রয়োগে বঙ্গভঙ্গ দ্বারা লোকসমাজে বিভক্তিরেখা টেনে দিয়ে। এর বিপরীতে সম্প্রীতির আদর্শ নিয়ে যে জাগরণ ঘটে বাঙালি সমাজে তার প্রভাব ছিল সুদূর-প্রসারী। সেই মিলনের আদর্শের প্রবক্তা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তিনি লিখেছিলেন সোনার বাংলার বন্দনা গান। তবে ভারতবর্ষীয় রাজনীতির ধারা বিভাজনের পথ ধরেই এগিয়েছে। দুইশ’ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে ১৯৪৭ সালে, তা যতটা না ছিল স্বাধীনতা, তার চেয়ে বেশি প্রতিভাত হয়েছিল ‘পার্টিশন’ হিসেবে। দ্বিজাতি-তত্ত্ব বা সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং পূর্ববাংলার বাঙালি নতুন নিগড়ে বাধা পড়ে।

এই জটিল কঠিন গ্রন্থিসমূহ মোচন করে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক জাতিচেতনায় বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করে যে মহান সংগ্রাম বঙ্গবন্ধু সংহত করেন, সব প্রতিরোধ চূর্ণ করে প্রতিষ্ঠা করেন বাঙালির জাতিরাষ্ট্র, সে সাফল্য হিমালয়সম। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের জয়গান তাই আমাদের নানাভাবে গাইতে হবে। সেই সঙ্গে সাফল্যের নানাদিক নিবিড়ভাবে অধ্যয়নও একান্ত জরুরি। সুবর্ণজয়ন্তীতে এই কর্তব্য আমরা পালন করেছি, তবে এক্ষেত্রে বর্তমানের করণীয় ও আগামীর প্রত্যাশাও বিবেচনায় নিতে হবে। আমরা অর্জন নিয়ে যেমন মুখরিত হবো, তেমনি জাতির দায়বদ্ধতা ও করণীয় সম্পর্কে আরও সচেতন ও দৃঢ়কর্তব্য হবো। হাজার বছরের সাংস্কৃতিক পরম্পরায় উদার সহিষ্ণু সম্প্রীতির সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সাম্যমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার। আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করি সাম্প্রদায়িক অপশক্তি আজ প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ নানাভাবে সম্প্রীতির আবহ বিনষ্ট করতে আঘাত হানছে। পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি আরোপ থেকে শুরু করে অন্যের ধর্মীয় উৎসবে হামলার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের প্রতি ঘৃণা ও সহিংসতা প্রচারের বাহন হয়ে উঠছে। দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের সম্পদ আত্মসাতের বিস্তার আমাদের উদ্বিগ্ন করে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রতি অবহেলা ও অদূরদর্শিতা আমাদের শঙ্কিত করে।

অর্থনৈতিকভাবে বিকশিত দেশ সাংস্কৃতিক বিকাশের শক্তি সহস্রভাবে পল্লবিত করবে, সেটাই আমাদের কাম্য। আর তাই সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ও প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক জাগরণের পথ তৈরি ও তা বিকাশে উপযুক্ত নীতি প্রণয়ন ও তার প্রয়োগ জরুরি হয়েছে। এক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রবণতা আমাদের ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্ভরতা বাঙালির চিরায়ত বৈশাখী উৎসব পালন সঙ্কুচিত করে দিচ্ছে, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে যাত্রাপালা মঞ্চায়ন নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, আমলানির্ভরতা স্বাধীনতা পদক প্রদানের জাতীয় উদ্যোগকে কলঙ্কিত করেছে। সেইসঙ্গে আমরা দেখি জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বরাদ্দ অতি নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে এবং দশকজুড়ে কোন উল্লেখযোগ্য উন্নতি সেখানে লক্ষিত হচ্ছে না। সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষে শতভাগ ঘরে পৌঁছে গেছে বিদ্যুতের আলো, এই অর্জন যেমন বাস্তব তেমনি প্রতীকী। তবে দেশের সব মানুষের জীবন যথাযথভাবে আলোকিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে অনেক। আমরা প্রায় শতভাগ শিশুর জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করতে পেরেছি, কিন্তু গুণগত শিক্ষার ক্ষেত্রে রয়েছে বিপুল ফারাক। বিত্তবানের জন্য উন্নত শিক্ষা ক্রয়ের সামর্থ্য ও সুযোগ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, তারা দেশে শিক্ষার এক পৃথক ঘরানা তৈরি করে ফেলেছে। অন্যদিকে পশ্চাৎপদ অবহেলিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের গুণগত শিক্ষা আমরা নিশ্চিত করতে পারছি না। সমাজে ধনবৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সমতালে কিংবা তার চেয়েও দ্রুতগতিতে। এইসব প্রবণতা সমাজে তৈরি করবে আরেক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা।

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে আমরা নতুন আশা নিয়ে সামনের দিকে এগোতে চাই। সবার জীবন বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি আমাদের দায়বদ্ধতা। সাংস্কৃতিক জাগরণের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ প্রতিহত করবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ষড়যন্ত্র। শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মধারা সব মানুষের জীবনে কল্যাণস্পর্শ বয়ে আনবে এবং এরই ধারাবাহিকতায় আমরা নির্মাণ করবো স্বাধীনতার সুবর্ণভূমি এই আমাদের প্রত্যাশা।



You have to login to comment this post. If You are registered then Login or Sign Up